শনিবার, জুন ২৫, ২০২২

চাকরিচ্যুত সাতক্ষীরার সাবেক এসপি আলতাফ হোসেনের নির্দেশে যে ভাবে ১২০ ভরি ওজনের স্বর্ণ হয়ে যায় মাদক

চাকরিচ্যুত সাতক্ষীরার সাবেক এসপি আলতাফ হোসেনের নির্দেশে যে ভাবে ১২০ ভরি ওজনের স্বর্ণ হয়ে

যায় মাদক

সাতক্ষীরা সংবাদদাতা।। ঝিনাইদহ থেকে বদলি হয়ে সীমান্ত জেলা সাতক্ষীরায় পুলিশ সুপার হিসেবে যোগদান করার পর একাধিক স্বর্ণের চালান আত্মাতের ঘটনার সাথে জড়িয়ে পড়েন আলতাফ হোসেন। তার মধ্যে পাটকেলঘাটা থানায় আটক ১২০ ভরি ওজনের স্বর্ণ আত্মসাতের অভিযোগে সদ্য চাকরিচ্যুত হয়েছেন সাতক্ষীরার সাবে পুলিশ সুপার আলতাফ হোসেন। মহামান্য রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে তাকে চাকরিচ্যুত করে গত ১৮ মে তারিখে এক প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। আলতাফ হোসেন সর্বশেষ সিলেট রিজিওন ট্যুরিস্ট পুলিশের পুলিশ সুপার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তার বিরুদ্ধে আটককৃত ১২০ ভরি ওজনের স্বর্ণ আত্মসাতের অভিযোগ প্রমানিত হওয়ায় তিনি চাকরি হারিয়েছেন।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, বিসিএস ক্যাডারের ২০ তম ব্যাচের পুলিশ অফিসার আলতাপ হোসেন। ঝিনাইদহ থেকে বদলি হয়ে গত ২০১৬
সালের ২৬ জুলাই তারিখে সাতক্ষীরায় যোগদান করে ২০১৭ এর ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত পুলিশ সুপার হিসাবে দায়িত্বে থাকাকালে আলতাফ
হোসেনের বিরুদ্ধে আটক হওয়া স্বর্ণ আত্মসাতের বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটে। এরমধ্যে ২০১৬ সালের ৭ অক্টোবর খুলনার সোনাডাঙ্গা
থেকে বিপ্লব চ্যাটার্জী নামের একজন স্বর্ণ চোরাচালানী স্বর্ণের একটি বড় চালান ভারতে পাচারের উদ্দেশ্যে সাতক্ষীরা অভিমুখে বাসে
চড়ে আসছিলেন। গোপনসূত্রে খবর পেয়ে ঝিনাইদহ জেলার হরিনাকুন্ডু থানার এএসআই আব্দুর রউফ পল্টু (সাতক্ষীরার পাটকেলঘাটার বাসিন্দা) ও কনস্টেবল মারুফ তাকে পথিমধ্যে আটক করে স্থানীয় সেনেরগাঁতী বাজারে নিয়ে যান। এসময় তার কাছ থেকে ওই স্বর্ণ ছিনতাই করার চেষ্টা করলে বাজারের লোকজন পুলিশের ওই দুই সদস্যকে গণপিটুনি দিয়ে স্বর্ণ বহনকারী বিপ্লব চ্যাটার্জীসহ ৩ জনকে আটক করে
পাটকেলঘাটা থানায় সোপর্দ করে। এসময় বিপ্লব চ্যাটার্জীর কাছে ৩ কেজি স্বর্ণ পাওয়ার ঘটনায় তৎকালীন ওসি মহিবুল ইসলাম পুলিশ
সুপার আলতাফ হোসেনকে অবহিত করেন। সন্ধ্যায় এসপি আলতাফ হোসেন পাটকেলঘাটা থানায় যেয়ে বিপ্লব চ্যাটার্জীর কাছ থেকে
জব্দ হওয়া ওই ৩ কেজি স্বর্ণ নিজের কাছে রেখে দেন এবং পুলিশের দুই

সদস্যকে ছেড়ে দিয়ে বিপ্লব চ্যাটার্জীকে একদিন পর ২১১ পিস ইয়াবা দিয়ে চালান দেওয়ার নির্দেশ দেন। এদিকে সেনেরগাঁতী বাজারে ছিনতাইকারী পুলিশের কবলে পড়ে বিপ্লব চ্যাটার্জী গ্রামবাসীকে জানিয়েছিলেন, তার কাছে ৩ কেজি সোনা আছে। এই সোনা ছিনতাই হচ্ছে, আপনারা আমাকে বাঁচান। এ ঘটনায় দেশের গণমাধ্যমে একাধিক রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। পুলিশ সুপারের কাছে এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি স্বর্ণ আটকের বিষয়টি স্বীকার কিংবা অস্বীকার কোনটি না করেই বলেন, আমি তদন্ত করে রিপোর্ট দেবো। অথচ দীর্ঘ সময়ের মধ্যে তিনি সেই রিপোর্ট আর সাংবাদিকদের দিতে চাননি। এই ঘটনার সত্যতা প্রমানিত হওয়ায় পুলিশের চাকরি থেকে তাকে অপসারণ করা হয়েছে।
তবে সেক্ষেত্রে ৩ কেজি নয়, ১২০ তোলা বা দেড় কেজি স্বর্ণ আত্মসাতের প্রমান মিলেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৭ সালের ১৩ জানুয়ারি শহরের তুফান মোড়ে আধুনিক জুয়েলার্স ও অদ্রি জুয়েলার্সে ভয়াবহ চুরির ঘটনায় ৩১৫ ভরি স্বর্ণালংকার ও আড়াই লক্ষ টাকা চুরির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় আটক সাতক্ষীরার বকচরা গ্রামের দাগী চোর নবাব আলী আদালতে চুরির বিষয়ে স্বীকারোক্তি দিয়ে জানায়, ৩১৫ ভরি স্বর্ণ তিনি সে সময় সাতক্ষীরা সদর থানার এসআই আসাদুজ্জামানের কাছে দিয়ে দিয়েছেন। আদালত আসাদুজ্জামানের কাছ থেকে এই স্বর্ণ আর উদ্ধার করতে পারেনি। সেসময় প্রচার হয়েছিল এই স্বর্ণের বড় অংশ পুলিশ সুপার আলতাফ হোসেনের পকেটে চলে গেছে। একই বছরের ১৯ মার্চ মানিকগঞ্জের সিংগাইর থেকে দুইজন স্বর্ণ কারিগর সাতক্ষীরার এক জুয়েলার্সের অর্ডার অনুযায়ী ২০০ ভরি স্বর্ণ নিয়ে আসছিলেন। পতিমধ্যে শহরের পলিটেকনিক মোড়ে গোয়েন্দা পুলিশের এসআই আবুল কাশেম, এসআই মোঃ বোরহান উদ্দিন ও এসআই নাসির তাদেরকে ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে ওই স্বর্ণ কেড়ে নেয়। পরে তারা সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবে এসে সাংবাদিকদের সামনে এ বিষয়ে অভিযোগ করেন। ওই স্বর্ণ তারা আর ফিরে পাননি। এ বিষয়ে পুলিশ সুপার আলতাফ হোসেন বলেছিলেন, তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এদিকে পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আলতাফ হোসেনের সময়ে ২০১৬ সালের ৮ আগস্ট সাতক্ষীরা শহরতলীর কুখরালির হোমিও ডাক্তার মোকলেসুর রহমান জনি রাত ৯টার দিকে শহরে ওষুধ কিনতে এলে সাতক্ষীরা থানার এসআই হিমেল তাকে ধরে নিয়ে যায়। এ খবর তার বাড়িতে পৌছালে বাবা রাশেদ ও জনির স্ত্রী জেসমিন তার সাথে এসে দেখা করে এবং তাকে খাবার দেন। পরপর তিনদিন এ অবস্থায় পরিবারের পক্ষ

থেকে তার সাথে দেখা করে খাবার পৌছে দেবার সময় বারবার তাদের কাছে মোটা অংকের টাকা চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা তা দিতে পারেননি। চতুর্থ দিন থানায় খাবার নিয়ে গেলে পুলিশ জানিয়ে দেয় তারা মোকলেসুর রহমান জনি নামের কোন লোককে গ্রেপ্তার করেনি।
এরপর তার স্ত্রী জেসমিন নাহার একটি প্রেস কনফারেন্স করে তার স্বামীর মুক্তি দাবি করেন। এ বিষয়ে থানায় জিডি করার চেষ্টা করলেও পুলিশ তা গ্রহণ করেনি। পরে তিনি হাইকোর্টে রীট করে স্বামী জনির মুক্তি দাবি করেন। হাইকোর্ট দুই সপ্তাহ সময় বেধে দিয়ে জনিকে খুজে
বের করার নির্দেশ দেন পুলিশকে। এসময় এসপি এক রিপোর্টে জানান, মোকলেসুর রহমান জনি আল্লাহর দলের সদস্য। আমরা তাকে
খুজছি। এ ঘটনার পর থেকে দফায় দফায় তদন্ত হয়ে এসপি আলতাফ হোসেন, ওসি এমদাদ হোসেন ও এসআই হিমেলের বিরুদ্ধে সাতক্ষীরার
জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট দায়িতপ্রাপ্ত হয়ে তদন্ত করে উচ্চ আদালতে রিপোর্ট দেন। এসপি আলতাফ হোসেন এই জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে শিবিরের লোক হিসেবে আখ্যায়িত করে জনির নিখোঁজ বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন। পরবর্তীতে এই তিন পুলিশ কর্মকর্তার শাস্তিমূলক বদলির পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চললেও নানা কারণে তা থমকে আছে।



Comments are Closed

error: Content is protected !!
%d bloggers like this: